দিপু সিদ্দিকী:::: পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট বিভাগে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর বাজার। প্রাথমিক হিসাব ও পশুর সংখ্যা অনুযায়ী, এবার পুরো সিলেট বিভাগে প্রায় ২১শ’ কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক লেনদেনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে এই বিপুল অঙ্কের বাজারের মাঝেও পশুখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে স্থানীয় খামারিদের। অবশ্য স্বস্তির খবর হলো, এবার সিলেট বিভাগে কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই।
পশুর সংখ্যা ও চলতি বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সিলেটে এবার কোরবানির পশুকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে রেকর্ড পরিমাণ টাকা হাতবদল হবে। সিলেট বিভাগের কোরবানিযোগ্য মোট ২ লাখ ৮৫ হাজার পশুর আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২,১৫০ কোটি টাকায়।
স্থানীয় খামারিরা জানান, দেশে প্রচলিত পশুখাদ্যের প্রায় সব ধরনের উপাদানের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সয়াবিন খৈল, গমের ভুসি, সরিষার খৈল, ভুট্টা, মসুর ও মুগের ভুসিসহ অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
পশুখাদ্যের এই আকাশছোঁয়া দামের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক, ছোট ও মাঝারি খামারিরা। কোরবানির পশু ব্যবসায়ী আজাদ মিয়া নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, এবার ঈদের জন্য ৫টি গরু কিনেছি। কয়েক মাসে শুধু তাদের খাবার আর পরিচর্যাতেই আমার অতিরিক্ত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন বাজারে যদি উপযুক্ত দাম না পাওয়া যায়, তবে লাভ তো দূরের কথা, আসল খরচই উঠবে না।
এদিকে পশু মোটাতাজাকরণে যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পদ্ধতি ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খামারিদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পশু মোটাতাজাকরণে স্টেরয়েড বা যেকোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার না করার জন্য খামারিদের সরাসরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপদ উপায়ে পশু পালনের জন্য খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার সিলেট বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ২৫টি ষাঁড়, ৩৫ হাজার ২৮৭টি বলদ, ২৮ হাজার ৭৯০টি গাভী, ৬ হাজার ৩৬৬টি মহিষ, ৭৩ হাজার ৮৮১টি ছাগল, ১৯ হাজার ৭৮টি ভেড়া এবং ৩ হাজার ৪৩৭টি অন্যান্য পশু।
চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত হয়েছে সিলেট জেলায়। এখানে চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৮টি পশুর। তার বিপরীতে প্রস্তুত আছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৫টি। গত বছরের তুলনায় জেলায় চাহিদা বেড়েছে ২০ হাজার ৩৯৭টি এবং উৎপাদন বেড়েছে ৫ হাজার ৭০৭টি। জেলার খামারগুলোতে বর্তমানে ৪৫ হাজারের বেশি ষাঁড় ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বলদ, গাভী, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলায় এবার কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি। প্রস্তুত রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৮৪টি পশু। তবে গত বছরের তুলনায় সেখানে চাহিদা কমেছে ৭ হাজার ১৫১টি এবং উৎপাদন কমেছে ৬ হাজার ৫৩টি।
হবিগঞ্জে চাহিদা রয়েছে ৪৬ হাজার ৩৫০টি পশুর। প্রস্তুত রয়েছে ৫০ হাজার ৮০২টি। জেলায় গত বছরের তুলনায় চাহিদা কমেছে ১৯ হাজার ২৩২টি এবং উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ হাজার পশু।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে এবার কোরবানির পশুর চাহিদা বেড়েছে ৬ হাজার ৯৯০টি। প্রস্তুত রয়েছে ৫২ হাজার ৫১৩টি পশু, যা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে বেশি।
বিক্রেতারা জানান, এবার কোরবানির হাটে মহিষ গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ষাঁড় গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, বলদ গড়ে ১ লাখ টাকা, গাভী গড়ে ৯০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য পশু গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, ছাগল গড়ে ১৫ হাজার টাকা।
ভেড়া গড়ে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রির আশা রয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে ছোট গরু ৭০/৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে ৩/৪ লাখ টাকায় সিলেটের বাজারে নিয়মিত বিক্রি হয়ে আসছে। সব মিলিয়ে পশুর দামের গড় হিসেবে এবার কোরবানির পশুর হাটে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি হাতবদল হবে। এছাড়া চামড়ার দাম এ হিসেবের বাইরে রয়েছে।
সার্বিক প্রস্তুতি ও পশুর সরবরাহ নিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দফতরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস। তিনি বলেন, এবার সিলেট বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশুর কোনো ঘাটতি নেই। বরং চাহিদার তুলনায় বেশি পশু থাকবে। তাই এবার বাইরে থেকে বা অন্য অঞ্চল থেকে পশু আনার কোনো প্রয়োজন হবে না।
Leave a Reply